সোমবার, ১৯ জুন, ২০১৭

আমি ধুলির মানুষ

আমি নজরুল নই, তাই বিদ্রোহী হতে পারিনা,
নই কবিগুরু রবীন্দ্র- বুঝতে পারিনা সাহিত্য-কী।
জীবনানন্দের মতো প্রকাশ করেতে জানিনা
মুগ্ধতা দেশ-রূপ প্রকৃতি।
দেখাতেও না পারি জসীম উদ্দিনের মতো-
গ্রাম বাংলা, গভীর-দেশপ্রেম আর ভালোবাসা।

সাধারণ, অতি সাধারণ নগণ্য এক যুবক আমি,
লিখতে গিয়েও পারিনা-মনের কথা, ক্ষোভ অসন্তুষ্টি।
স্বার্থপর পৃথিবী'র স্বার্থান্ধ মানুষ কত-রূপি
কেবল দুঃখই দিয়ে গেল, যে যতো পারে মন-ভরি!

দুচোখ যায় যতদূর- দেখি সুন্দর রূপ-প্রকৃতি,
মুগ্ধ নয়ন কৃতজ্ঞ স্রষ্টা'য় অপরূপ-বিশ্ব সৃষ্টি।
মানুষের বোধ বিচারে কত চ্যুতি আর বিচ্যুতি!!

নির্মম শোষণে দগ্ধ সদা শোষিত,
ভেঙে যায় মন, বিষণ্ণ প্লাবন
ধরে আগুন রক্তে বারুদ জ্বলন্ত।
তবু আমি দুর্বল শীর্ণ মনে রয়ে যাই চুপ,
বিবেকের ধ্বংসনে নিজেকেই করি ক্ষত।
প্রতিবাদ জানিনা কোনো- বোবা আমি,
ভুলে থাকি সহস্র শোষিতের দুঃখ-বেদনা,
ভুলে চেতনা, জাতি-গৌরব, নিজ-কৃষ্টি! 

আমি ধুলির মানুষ, ক্ষুদ্রতে রাখি বিশ্বাস,
ধুলো মেখে গায় মাতিয়া ফিরি, উচ্ছাস
আনন্দে ভরি,পথের মাঝে ছাড়ি নিঃশ্বাস।

অতি ছোট নগণ্য, অগণিত বৃহৎ সমারোহে
আমি কণা-মাত্র, মনুষ্যত্ব পূঁজি-তা বিরহে,
হই সৃষ্টিসুখে ধন্য, বারে বারে মন-তা কহে।

কবিগান বাহে প্রাণ, কবি-মনে সৃজি মনস্তুষ্টি
স্রষ্টা-প্রেমে মহিয়ান বিশ্বাসীবাদ, অমর সৃষ্টি-
ক্ষুদ্রে খুঁজিব জ্ঞান, সদাগতি ধীরভাবে তুষ্টি।

রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

ফরিদ আহম্মদ চৌধুরী

হে- ফরিদ আহমদ চৌধুরী, স্ব-গুণে
দিচ্ছেন প্রেরণা, সব জনে প্রীত, ঢেলে
জ্ঞান ভাণ্ডার-উজাড় মুক্ত, সু-যতনে
সাহিত্য খুঁজে ফেরেন সনেট তা বলে।
নিরহঙ্কার সদা-এ কবি প্রীত জনে,
নতুনে মুগ্ধ হৃদয়, চেষ্টা মনোবলে-
অনুপ্রেরণা-র আলো রেখেছেন জ্বেলে।
ভালোবাসা প্রেম বায়ু সদা বা-য় মনে।

মনে-র আকাশ জুড়ে যতো দি-ন যাবে-
শ্রদ্ধা ভালবাসা প্রেম দেবো আপনা-তে,
জ্যোতির্ময় এ-প্রতিভা থাকুক স্ব-ভাবে,
মুগ্ধতা-যে পুরোপুরি পারিনা বোঝাতে!
গুরু প্রেমে শিষ্য সদা, নয়ন জোড়াবে
পৃথ্বী'র, থাকুন স্বর্গে মো-র কামানা-তে।

কবিতাটি আমার শ্রদ্ধেয় প্রিয় কবি 'ফরিদ আহমদ চৌধুরী'র প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা থেকেই সৃষ্টি করেছি। জানিনা আমি আমার শ্রদ্ধা ভালোবাসা কতটা প্রকাশ করতে পেরেছি, তবে লিখতে পেরেছি তাঁকে নিয়ে এটিই আমার জন্য খুব বেশি আনন্দের মনে হচ্ছে।
তাঁর কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণা অনুপ্রাণিত করে আমাকে নতুনত্বের খুঁজে। আমি যেন তার প্রতি এই শ্রদ্ধা ভালোবাসা আন্তরিকতাটুকু ধরে রাখার যোগ্য হই কামনা স্রষ্টায়।

শনিবার, ১৭ জুন, ২০১৭

গন্তব্য (প্রকৃতি-সনেট)

কত শত পথ ঘুরে দেখা তব স-নে,
বিচলিত যত গুণে মিলে-তা বিরলে;
এ-পূর্ণিমা রূপ যেন দেখি-গো নয়নে!
মুগ্ধ হিয়া, দ্বীন ক্ষণ যায়-গো গড়লে।
মানবী না পরী তুমি, চেনে জনে জনে,
চন্দ্রসূর্য ধ্রুব তারা, অাছো চোখ মেলে;
মমতা পরশ যতো দিলে তুমি ঢেলে,
কাঙ্ক্ষিত রূপ-পাগল মিশে সব মনে।

ভুলিব না এজীবনে, তব রূপ গাবে,
কামনা রাত দুপুর সন্ধ্যা কিবা প্রাতে;
ভুবনজয়ী রূপ কে দেখেছো, কিভাবে!
স্মরি-ব পূঁজি সৃজি-ব বসন্ত-ভূ-প্রান্তে।
সঁপেছি এ-দেহ ইচ্ছে, ডুবেছি স্বভাবে,
আজ বুঝেছি আমার গন্তব্য তোমাতে।

গন্তব্য

কত শত পথ ঘুরে দেখা তব স-নে,
বিচলিত যত গুণে মিলে-তা বিরলে;
এ-পূর্ণিমা রূপ যেন দেখি-গো নয়নে!
মুগ্ধ হিয়া, দ্বীন ক্ষণ যায়-গো গড়লে।
মানবী না পরী তুমি, চেনে জনে জনে,
চন্দ্রসূর্য ধ্রুব তারা, অাছো চোখ মেলে;
মমতা পরশ যতো দিলে তুমি ঢেলে,
কাঙ্ক্ষিত রূপ-পাগল মিশে সব মনে।

ভুলিব না এজীবনে, তব রূপ গাবে,
কামনা রাত দুপুর সন্ধ্যা কিবা প্রাতে;
ভুবনজয়ী রূপ কে দেখেছো, কিভাবে!
স্মরি-ব পূঁজি সৃজি-ব বসন্ত-ভূ-প্রান্তে।
সঁপেছি এ-দেহ ইচ্ছে ডুবেছি স্বভাবে,
বুঝেছি আজ আমার গন্তব্য তোমাতে।

সনেট : মধুসূদন দত্ত

লেখক বলেছেন: একটা উদাহরণ এখানে দিচ্ছি, তাহলে অন্ত্যমিলের বৈচিত্র্য বুঝবেন সহজেই। মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'কপোতাক্ষ নদ' দেখুন :

সতত, হে নদ তুমি পড় মোর মনে-----ক

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে।---খ

সতত যেমনি লোক নিশার স্বপনে-----ক

শোনে মায়া যন্ত্র ধ্বনি তব কলকলে----খ

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে।----ক

বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ দলে--------খ

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মেটে কার জলে---খ

দুগ্ধস্রোতরূপি তুমি মাতৃভূমি স্তনে।-----ক

আর কি হে হবে দেখা যত দিন যাবে----গ

প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে------ঘ

বারি রূপ কর তুমি এ মিনতি গাবে------গ

বঙ্গজ জনের কানে সখে-সখারিতে।-----ঘ

নাম তার এ প্রবাসে মজি প্রেমভাবে-----গ

লইছে যে নাম তব বঙ্গের সঙ্গীতে। -----ঘ

প্রথম পঙ্‌ক্তির শেষ শব্দ 'মনে'র সাথে ৩য় পঙ্‌ক্তির শেষ শব্দ 'স্বপনে'র মিল রয়েছে, তাই না? আবার ২য় পঙ্‌ক্তির শেষ শব্দ 'বিরলে'র সাথে ৪র্থ পঙ্‌ক্তির শেষ শব্দ 'কলকলে'র মিল রয়েছে। এভাবে বাকিগুলো পরীক্ষা করে দেখুন।

সোনাবিজ অথবা ধুলোবালিছাই/সামহোয়্যারইনব্লগ

শুক্রবার, ১৬ জুন, ২০১৭

দুই শিশু সন্তানের সামনে মা কমলাকে নির্যাতন করে মেরেই ফেললো স্বামীগৃহে

জুলহাস ও তার ছেলে মানিক কতৃক অমানষিক হত্যাকান্ডের শিকার দুই সন্তানের জননী  কমলা!!!কুষ্টিয়ার মিরপুর থানার পোড়াদহর সেন্টারপাড়া।।

রোজা থাকা কমলাকে প্রথমে গালে ঘুষি  মারা হয়েছে, এতে মেঝেতে পড়ে গেলে তার ঘাড়ে কষে লাথি মারা হয়েছে, তবুও হতচ্ছাড়া মেয়েটি মরতে চায়নি! কারন ওর তো ছয় বছর বয়সী ছেলে আর আড়াই বছর বয়সী মেয়ে আছে, ওর মরলে চলে?

যাহোক, তারপর ওকে নিয়ে স্বামী, শাশুড়ী, শ্বশুরেরা মিলে ফুটবল খেলেছে। এ লাথি মেরে ওর কাছে পাঠিয়েছে, ও আবার আরেকজনের কাছে।

নাছোড়বান্দা কমলা তবুও মরতে চায়নি, দুধের শিশু মেয়েটির মুখ মনে পড়ে গেছিলো বলে বোধহয়। 'নিরুপায়' স্বামী-শাশুড়ীর আর কিই বা করার ছিলো! বাধ্য হয়ে রড হাতে তুলে নিয়েছিলো তারা, তারপর মেঝেতে ফেলে বেধড়ক পিটুনি....

ঘটনা শেষ হতে যেয়েও হলো না। কারন এত কিছুর পরেও কমলার বেঁচে থাকার সাধ হলো!!! উপায়ন্তর না পেয়ে 'অসহায়' স্বামীকূল মারপিট বাদ দিয়ে সবাই মিলে মৃতপ্রায় কমলার মুখে এবার গ্লাসে করে বিষ ঢেলে দিলো। কি জানি, অর্ধচেতন কমলা হয়তো পানি মনে করে বিষটুকু খুব তৃপ্তি সহকারে খেয়েছে। সবশেষে পেশাদারী তৃপ্তি পেতে গলা টিপে সমাপ্ত করা হয়েছে এই মারণযজ্ঞ। এই সব কিছু হয়েছে কমলার দুই শিশু সন্তানের সামনে। হতবাক হলেও অবাক লাগেনি যখন শুনি লোকাল পুলিশ কমলার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন খুঁজে পায়নি, সিনা চওড়া করে হেঁটে বেড়াচ্ছে স্বামী-শ্বশুর, কেউ গ্রেফতার হয়নি। এতে নিশ্চয় সবাই বুঝতে পেরেছেন কমলার বাবা এক নিরীহ কৃষকগোছেরই কেউ হবে। কমলার পিতার নাম সেকেন্দার আলী, গ্রাম বুরাপাড়া।

সংগ্রহ : আবন্দুল্লাহ্ আল মামুন এর ফেসবুক পোষ্ট।

মনের মানুষ আসবে ফিরে

কি আশায় উদাস দুচোখ, ভরা গাঙ্গে
কার প্রতীক্ষা, ঢেউ গুনিয়া মন ভাঙে-
রৌদ্র দুপুর শান্ত বিকেল সন্ধ্যা সাজে?
গোধূলি রাঙা হৃদয় কোণে সুর বাজে-
যার মায়ায়, নৃত্যে হিয়া কোন'সে গানে
ক্লান্ত বদন, ভাসো সদা'য় প্রেমো-বানে?
শ্রাবণ ভারী নয়ন ঝরে নদী-পাঁড়ে,
বাঁধবে নাকি ভালোবাসা'য়, স্বপ্ন বাড়ে?

আকাশ জোড়া চন্দ্রসূর্য নিয়ম করে-
জোছনা রোদে মুগ্ধ মানুষ প্রয়োজনে।
গোলাপ বকুল গন্ধে সদা মুগ্ধ করে;
কাষ্ঠ দেখো পরোপকার করছে পুড়ে।
ভালোবাসা রইবে না কভু অবিশ্বাসে,
বিশ্বাসে মনের মানুষ আসবে ফিরে।।

বুধবার, ১৪ জুন, ২০১৭

বন্ধু আমার দূরে থাকে

আমায় ধরছে প্রেমের আগুনে
বন্ধু আমার দূরে থাকে, আসে না কাছে।।
মনের যতো স্বপ্ন আশা।। সবি বন্ধুরে নিয়ে।
বন্ধু আমার দূরে থাকে, আসে না কাছে!!

গতবছর গঞ্জের মেলায়, আমায় সাথে নিয়া
সুযোগ বুঝে রসের খেলায় উঠছিল মাতিয়া।।
নিবা ছিল মনের আগুন।। সেইযে গেলো বাড়িয়ে।
বন্ধু আমার দূরে থাকে, আসে না কাছে!!

রসের বেয়াইন জানে কত মিষ্টি মধুর খেলা
বছর গেল তবুও তারে গেল না আর ভুলা।।
স্বপ্নে ভাসায় প্রেমের গাঙে।। ভুলি তারে কেমনে।
বন্ধু আমার দূরে থাকে, আসে না কাছে!!

কেমনে জিগাই ভাবির কাছে বেয়াইনের খবর
রসের খেলায় সে আমারে কইরাছে পাগল।।
আদর সোহাগ কইরা কত।। বলছিল ভালোবাসে।
বন্ধু আমার দূরে থাকে, আসে না কাছে!!

মঙ্গলবার, ৬ জুন, ২০১৭

পিরিত আমার হইল না'রে

অলস দুপুর গাছের ডালে,
ডাকছে কোকিল মধুর সুরে;
পায়রী দেখে টিনের চালে,
বাকবাকম পায়রা ডাকে।
শর্ষে দানা পানির বাটি,
খুব যতনে সাজিয়ে আমি;
ডাকছি কতই হাত বাড়িয়ে,
ভালোবাসা-র মায়া ছড়িয়ে।
দুষ্টু পায়রা কিছুনা বুঝে, 
দূরেই থাকে আসেনা ঘরে!
পুকুর ভরা মিষ্টি পানি,
হংসী মত্ত হাসের প্রেমে;
শামুক কুড়া দিলাম মাখি,
এক নজর দেখে'না ফিরে!
উদাস দুচোখ মন শ্রাবণে,
পিরিত আমার হইল নারে।

ভাসা পানি খালে বিলে,
করছো খেলা মন আনন্দে;
ঝাঁপা-ঝাঁপি সুখ আবেসে,
ক্লান্ত হবে ডুব সাতারে।
গভীর পুকুর অথৈ নদী,
উঠবে ডানা ব্যথায় ভরি;
করবে যতই আসন সুখে,
অস্থির হবেই খরস্রোতে।
হঠাৎ করে জল তরঙ্গে,
পরবে ভীষণ বরিষণে।
তুমুল খরা তৃপ্তি জানি,
পাখির সঙ্গ ভাবের কালে;
ভাবুক কথা প্রেমের দাবী,
ভুলল পাখি রইল দূরে!
কষ্টে হৃদয় যাচ্ছে পুঁড়ে,
পিরিত আমার হইল নারে।

স্বচ্ছ আকাশ মেঘের ফাঁকে,
মন খুশিতে রোদ বৃষ্টি-তে;
বনজঙ্গল আর উঁচু ডালে,
ঘুরতে বসতে ক্লান্ত হবে।
ভাঙবে ডানা কাঁদবে জানি,
ভাসবে তোমার হৃদয় ভূমি;
পড়বে যেদিন হঠাৎ ঝড়ে,
সঙ্গী তোমার কেউ না রবে।
খসবে পালক ভিজবে জলে,
আমায় ভীষণ পড়বে মনে।
তুখোড় চলা মিষ্টি ভাষী,
আঁকি চিত্র মনের ফ্রেমে;
বুঝবে সেদিন ভালোবাসি,
আমায় যেদিন মরণ ছোঁবে!
তোমায় সৃজি মন মন্দিরে,
পিরিত আমার হইল নারে!!

রবিবার, ৪ জুন, ২০১৭

আমার কৈফিয়ত : কাজী নজরুল ইসলাম

আমার কৈফিয়ৎ – কাজী নজরুল ইসলাম

বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’,
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুঁজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে-বাণী কই কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!

কবি-বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে!
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাশ ঠেলে’।
পড়ে না ক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হয়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে!
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো ফের যেন তুই যাস জেলে!

গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছা!
প্রতি শনিবারী চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি!’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!’
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!

মৌ-লোভী যত মৌলবী আর ‘ মোল্‌-লা’রা ক’ন হাত নেড়ে’,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!
ফতোয়া দিলাম- কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আমপারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!
হিন্দুরা ভাবে,‘ পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!’

আনকোরা যত নন্‌ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন্‌ খুশী।
‘ভায়োরেন্সের ভায়োলিন্‌’ নাকি আমি, বিপ্লবী-মন তুষি!
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চর্‌কার গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কন্‌ফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের আঙ্কুশি!

নর ভাবে, আমি বড় নারী-ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী-বিদ্বেষী!
‘বিলেত ফেরনি?’ প্রবাসী-বন্ধু ক’ন, ‘ এই তব বিদ্যে, ছি!’
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি!’-
যুগের না হই, হজুগের কবি
বটি ত রে দাদা, আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ্‌-পেশী,
দু’কানে চশ্‌মা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্‌ বেশী!

কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুণ্ডু আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না ত ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু! তোমরা দিলে না ক’ দাম,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান!
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরিছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?

বন্ধু! তুমি ত দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হ’ল শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তা’রে করিনু বিকল,
তবু যদি কথা শোনে সে পাগল! মানিল না ররি-গান্ধীরে।
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে’!

আমি বলি, ওরে কথা শোন্‌ ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস্‌ খোশ্‌-হালে!
প্রায় ‘হাফ’-নেতা হ’য়ে উঠেছিস্‌, এবার এ দাঁও ফস্‌কালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায়!
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্‌ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।

বোঝে না ক’ যে সে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে,
গান শুন সবে ভাবে, ভাবনা কি! দিন যাবে এবে পান খেয়ে!
রবে না ক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্‌ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্‌ চেয়ে!

ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছে কি? কালি ও চুন
কেন ওঠে না ক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?

আমরা ত জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস!
কত শত কোটি ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটি টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হ’তে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!

বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে!
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।
রক্ত ঝরাতে পারি না ত একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসে না ক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথায় উপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!

সংগ্রহ - বিদ্রোহী ভৃগু